রোকেয়ার সুলতানার স্বপ্ন: প্রসঙ্গ পরিবেশ-নারীবাদ
মৌলিক
গবেষণা
![]()
সাহিত্য পত্রিকা
|
Journal.bangla.du.ac.bd |
DOI: 10.62328/sp.v60i1-2.8 |
|
|
Print ISSN: 0558-1583 |
প্রবন্ধ জমাদান: ১৩ এপ্রিল
২০২৫ |
|
|
Online ISSN: 3006-886X |
প্রবন্ধ গৃহীত: ১৫ মে
২০২৫ |
|
|
মৌলিক গবেষণা প্ৰবন্ধ
|
পৃষ্ঠা: ১২৯-১৪৩ |
|
|
সাহিত্য পত্রিকা Journal.bangla.du.ac.bd Print ISSN : 0558-1583 Online
ISSN: 3006-886X বর্ষ: ৬০ সংখ্যা: ১-২ |
|
|
|
রোকেয়ার
সুলতানার স্বপ্ন: প্রসঙ্গ পরিবেশ-নারীবাদ
নিপা জাহান
সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: nepazahan144@gmail.com
সারসংক্ষেপ
সুলতানার স্বপ্ন রোকেয়া রচিত ‘বৈজ্ঞানিক ইউটোপিয়া'। রচনার প্রায় সোয়া শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে এসে এই টেক্সট আন্তর্জাতিক
স্বীকৃতি অর্জন করেছে এর অন্তর্নিহিত ভাব-ভাষ্য ও স্বাতন্ত্র্য বিবেচনায়। নারীবাদ
সুলতানার স্বপ্নের মর্মবীজ—অদ্যাবধি বিভিন্ন আলোচনা-সমালোচনায় তা নানাভাবে
এসেছে। তবে সুস্পষ্টভাবে পরিবেশ-নারীবাদ কীভাবে এই রচনার বয়নে কার্যকর, তা নিবিড়ভাবে পাঠ ও বিশ্লেষণের
মাধ্যমে দেখার অবকাশ রয়ে গেছে। পিতৃতন্ত্রের আগ্রাসন নারী ও প্রকৃতির ওপর একই তালে
চলে আসছে। এই ব্যবস্থার পরিবর্তন ও অবসান-প্রত্যাশী হিসেবে নারী ও প্রকৃতির জন্য নিরাপদ
এক স্বর্গরাজ্য (নারীস্থান) রোকেয়া নির্মাণ করেছেন এই টেক্সটে। ভারতবর্ষীয় প্রেক্ষাপটে
পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারী-জীবনের যাবতীয় সামাজিক ট্যাবু, অবদমন ও লৈঙ্গিক রাজনীতির বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত সাহিত্যিক প্রতিকার ও প্রতিশোধ
এটি। পরিবেশ-নারীবাদের আলোচ্য ও নারীবাদের উদ্দিষ্ট বিভিন্ন দিক রোকেয়ার এই প্রকল্পে
বেশ জোরালোভাবে উপস্থিত—যদিও টেক্সটটি বর্ণিত তত্ত্বের পূর্বগামী।
গুরুত্বপূর্ণ নারীবাদী লেখক তথা পরিবেশ-নারীবাদের আদি প্রবক্তা হিসেবে প্রতিভাত রোকেয়া
কীভাবে সাহিত্যিক বয়ানের মাধ্যমে বিজ্ঞান,
তত্ত্ব তথা মানবচিন্তার ভবিষ্যৎজ্ঞাপক নির্দেশনায় নারী, প্রকৃতি ও মানুষের জন্য কল্যাণকর এক ভূখণ্ড নির্মাণ করা যায়, প্রকারান্তরে এরই একটি প্রস্তাবনা রেখেছেন আলোচ্য টেক্সটে। আর সুলতানার
স্বপ্নকে পরিবেশ-নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠ রোকেয়ার এই উচ্চাভিলাষী অথচ বিজ্ঞানসম্মত
ও বাস্তবায়নসম্ভব কল্পনার যৌক্তিকতা প্রতিপন্ন করার ভিত্তি প্রদান করে। আমাদের বর্তমান
প্রকল্প এই যৌক্তিকতা নিরূপণের প্রয়াসেই পরিচালিত হয়েছে।
মূলশব্দ
সুলাতানার স্বপ্ন, পরিবেশ-নারীবাদ, নারীবাদ, সবুজ আন্দোলন, পুরুষতান্ত্রিক বয়ান, নারীজীবন, চিন্তনের অগ্রগামিতা।
১
নারীবাদ মূলত নারীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক রূপায়ণের বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের মতবাদ। আর প্রকৃতি
ও নারীর প্রতি পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ও রাজনৈতিক কাঠামোর পীড়নের বিরোধিতামূলক দার্শনিক
দৃষ্টিভঙ্গি ধারণকারী মতবাদ পরিবেশ-নারীবাদ বা ইকোফেমিনিজম। প্রচলিত পিতৃতান্ত্রিক
কোনো দেশ নারীতান্ত্রিক হলে তা কেমন হবে বা হতে পারে, এমন
কল্পনা থেকেই রোকেয়া এক ইউটোপিক ‘নারীস্থান'কে নির্মাণ করেন তাঁর সুলতানার স্বপ্নে।১ বিষয়-ভাবনায় মূলত ‘র্যাডিক্যাল নারীবাদ’২
কার্যকর থাকলেও প্রায় সর্বত্র এই টেক্সটের লেখক পরিবেশ-নারীবাদের
নানা দিক প্রাসঙ্গিক করে তুলেছেন। উল্লেখ্য, পরিবেশ-নারীবাদ
ধারণার সূত্রপাত ঘটে গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে।৩ প্রায় সোয়া এক শতাব্দ-পূর্বের
রচনা হলেও অথরের ‘ফ্যান্টাসি' ও টেক্সটের
‘ফ্যাক্ট’ বিবেচনায় Sultana's
Dream বর্তমান সময়েও প্রাসঙ্গিক ও পাঠকের জন্য আগ্রহ উদ্দীপক। পরিবেশ-নারীবাদের
আলোকে সুলতানার স্বপ্নপাঠের প্রবেশক হিসেবে এই টেক্সটের গুরুত্বপূর্ণ পাঠ ও মূল্যায়নের
চুম্বকাংশ উপস্থাপন এবং পরিবেশ-নারীবাদের তত্ত্বগত রূপ সম্পর্কে ধারণা নেওয়া প্রয়োজন।
২
বিশ শতকের প্রথম দশকে প্রকাশিত হয় সুলতানার
স্বপ্ন (১৯০৫)। প্রকাশের প্রায় সোয়া এক শতাব্দী পরে সম্প্রতি (২০২৪ সালে) এই রচনাটি
ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড মেমোরিতে নারী রচিত ইউটোপীয় নভেল হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। প্রকাশের
পর থেকেই সুলতানার স্বপ্ন আগ্রহী পাঠক-সমালোচকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং জনপ্রিয়ভাবে
নারী-রচিত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি হিসেবে পঠিত ও বিশ্লেষিত হয়েছে। ১৯০৮ সালের ডিসেম্বরে
The Musalman পত্রিকায়
এই গ্রন্থ সম্পর্কে লেখা হয়:
This is a booklet written in English by Mrs. R.
S. Hossain. Sultana, an imaginary character, is attributed a marvelous dream in
which she was transported to an imaginary land ruled by a female sovereign,
where peace and happiness reign supreme. The male members in that imaginary
land discharge the functions of women in the real world, and the women do those
of men. The conception is a very ingenuous hit at the purdah system prevailing
in the Mohamedan world. We have found a genuine pleasure in the perusal of the
booklet. It seems to us that Mrs. R. S. Hossain the able authoress is a Lady of
whom any nation may be proud. (বেগম রোকেয়া ২০০৬ : ৬২৮)
১৩২৮ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণে প্রকাশিত সাধনা
পত্রিকায় Sultana's Dream গ্রন্থের আলোচনায় আবুল হুসেন লেখেন:
‘Sultana's Dream-এর
মধ্যে পুরুষকে অবরুদ্ধ করিবার একমাত্র হেতু; আমাদের নারীজাতির
দাসত্ব, অর্থাৎ পুরুষের উপর একান্ত নির্ভরতা। পুরুষ না হইলে
আমাদের নারী একেবারে অকর্মণ্য ও অসহায়, মূর্খ ও অজ্ঞ বলিয়া
সে পুরুষের উপর তাহার জীবনের মাত্র অস্তিত্বটুকুর জন্য নির্ভরশীল, এ কথা কেবল পুরুষের দ্বারাই নিখিল বিশ্বে ঘোষিত হইয়াছে, এবং সেই ঘোষণা দ্বারা নারীও তাহার শক্তি আছে—এ কথা বিশ্বাসই করিতে পারে না। পক্ষান্তরে নারী যে ক্ষমতাসম্পন্ন, সে যে পুরুষের মতো, এমনকি তদপেক্ষা অধিকতর প্রতিভাবতী হইতে পারে তাহার শক্তিকে জাগ্রত করিলে
যে প্রকৃতিকে নিজের আয়ত্তাধীন করিয়া পুরুষের বিন্দুমাত্র সাহায্য ব্যতিরেকে সে দুনিয়ার
বুকে নির্মল সৌন্দর্য, সম্পদ ও কল্যাণের বিরাট ক্ষেত্র সৃষ্টি
করিতে পারে, তাহা ঐ Lady Land-এর
নারীদের ক্ষমতার দৃষ্টান্ত দ্বারা মিসেস আর. এস. হোসেন অতি অসহায়া বঙ্গীয়া নারী-হৃদয়ে
আত্মবিশ্বাস ও আত্মশক্তির বীজ বপন করিবার উদ্দেশ্যে বোধ করি এই Sultana's
Dream রচনা করিয়াছেন। (২০০৬: 627)
আলোচ্য গ্রন্থের প্রকাশের মাত্র এক যুগ পর
ঢাকার 'মুসলিম সাহিত্য
সমাজে'র সদস্য ও এই সংগঠনের মুখপত্র শিখা পত্রিকার সম্পাদক
আবুল হুসেন Lady Land-এর রচনার উদ্দেশ্য হিসেবে তৎকালীন ‘পুরুষ নির্ভর' নারীসমাজের ‘আত্মবিশ্বাস ও আত্মশক্তি’ সন্ধানের ‘বীজ রোপণ' বলে যথার্থভাবেই চিহ্নিত করেছিলেন।
ঢাকার ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে'র অপর
এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোক্তা ও রোকেয়া রচনাবলীর সম্পাদক আবদুল কাদির ‘বেগম রোকেয়ার সাহিত্য-কীর্তি' শীর্ষক প্রবন্ধে
লেখেন:
Sultana's Dream ব্যঙ্গরসাত্মক
রচনা—‘নারীস্থানে'র এক অদ্ভুত পরিকল্পনা। সেখানে নারীর বাহুবলে নয়, মস্তিষ্ক-বলে পুরুষ পরাস্ত, নারী-প্রতিষ্ঠিত সেই
স্বপ্ন-সমাজে পুরুষ minor—'মৰ্দ্দানা'বাসী। নারীর এবম্বিধ বিবর্তনের কারণ সম্বন্ধে তিনি [রোকেয়া] বলিয়াছেন:
'শিক্ষার বিমল জ্যোতিতে কুসংস্কাররূপ অন্ধকার দূরীভূত হইয়া
গেল।' (২০০৬: ৬০৩)
আবদুল কাদিরসহ পরবর্তী প্রায় সব সমালোচকই
এই গ্রন্থে নারীবাদী বক্তব্যের স্পষ্টতার বিষয়ে বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলেছেন। আবুল
হুসেনও এই গ্রন্থালোচনায় ‘নারী' সম্পর্কে প্রচলিত পুরুষ-ন্যারেটিভের বিপরীতার্থক
ন্যারেটিভ আবিষ্কার করেছিলেন। আবদুল মান্নান সৈয়দ ও হুমায়ুন আজাদের বক্তব্যে তা আরো
স্পষ্টরূপ লাভ করেছে। আবদুল মান্নান সৈয়দের ভাষায়:
কমলাকান্তের মতো তন্দ্রাচ্ছন্ন
অবস্থায় কল্পনাবিহার রোকেয়ার কয়েকটি নকশায় পাওয়া যায়, সুলতানার স্বপ্ন তার একটি। ... লেখাটির
প্রথম ভোক্তা রোকেয়ার স্বামী রচনাটি পাঠ করেই বলে উঠেছিলেন, ' A terrible
revenge ' ! এই প্রতিশোধ সমগ্র পুরুষশাসিত সমাজের বিরুদ্ধে। রোকেয়া
এখানে বিদ্রুপাত্মক নন—স্বপ্ননিবিড়। নারীস্থান রোকেয়ার মানসলোকে
এক আর্কেডিয়া, ছোট হলেও
এক সম্পূর্ণ পৃথিবী, স্বপ্ন হলেও রোকেয়ার স্বভাবশোভন যুক্তিজীবিত,
ক্ষণভঙ্গুর হলেও অবিশ্বাস্য নয়। (২০১৮: ২০৭)
***
রোকেয়ার নারীবাদী বয়ানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য
নিদর্শন হিসেবে সুলতানার স্বপ্নকে চিহ্নিত করে হুমায়ুন আজাদ তাঁর নারী গ্রন্থের ‘পুরুষতন্ত্র ও রোকেয়ার নারীবাদ'
প্রবন্ধে বলেছেন:
রোকেয়া পুরুষের সমাজকেই
অস্বীকার ক'রে প্রতিষ্ঠা
করেন তাঁর নারীস্থান। রোকেয়ার পক্ষে অসম্ভব ছিল ‘Sultana's Dream' বা 'সুলতানার স্বপ্ন' না লেখা; কেননা নারীতন্ত্র বা নারী-আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত
দেখা ছিল তাঁর জন্য অনিবার্য। এজন্যে তাঁকেই লিখতে হয় বাঙলা ভাষায় প্রথম ও শেষ ইউটোপিয়া,
সম্ভবত কোনো এশীয় ভাষায়ও এটিই একমাত্র ইউটোপিয়া। পঁচিশ বছরের এক
আমূল নারীবাদী তরুণীর নারী-আধিপত্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে ‘সুলতানার স্বপ্ন'-এ, যা
কোমলমধুর কিন্তু প্রতিশোধস্পৃহায় ক্ষমাহীন নির্মম। রোকেয়া ব্যাপকভাবে নারীস্থানের
সমাজজীবন উপস্থাপিত করেন নি, কিন্তু সম্পূর্ণরূপে অবরুদ্ধ
করেছেন পুরুষদের। রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন' বৈজ্ঞানিক ইউটোপিয়া; তিনি কোনো আদিম স্বর্ণযুগ
সৃষ্টি করেন নি, সৃষ্টি করেছেন ভবিষ্যতের বিজ্ঞাননির্ভর সমাজ,
কেননা বিজ্ঞানই শুধু মুক্তি দিতে পারে নারীকে। রোকেয়া নারীর শারীরিক
দুর্বলতা সম্পর্কে ছিলেন সচেতন, তাই কোনো আদিম আর্কেডিয়া
তাঁর কাজে আসতো না; তার দরকার ছিল এমন শক্তি, যা শারীরিক শক্তিকে সহজেই পরাভূত করে। বিজ্ঞান সে শক্তি, তাই রোকেয়ার নারীস্থান বিজ্ঞাননির্ভর। রোকেয়ার নারীস্থান তাঁর স্বদেশের
বিপরীত ... তিনি তাঁর নারীস্থান থেকে মুছে ফেলেছেন ভারতবর্ষের সমস্ত সামাজিক ব্যাধি।
‘সুলতানার স্বপ্ন’ রোকেয়ার নারীতন্ত্রের চূড়ান্ত বিজয়ের
ও পুরুষতন্ত্রের চূড়ান্ত পরাজয়ের কাহিনী। (২০০৭: ২৯৫-২৯৬)
রোকেয়ার নারীবাদ ও সুলতানার স্বপ্নে এর
সফল প্রয়োগগত বিশ্লেষণ আজাদের লেখার উদ্ধৃতাংশে স্পষ্ট। এই গ্রন্থ ও রোকেয়ার অপরাপর
গ্রন্থ এবং তাঁর জীবন ও আদর্শিক অবস্থান বিশ্লেষণ করে আজাদ তাঁকে নারীবাদের ইতিহাসে
বিশ্বের অন্যতম যুক্তিবাদী ও দ্রোহী নারীবাদী হিসেবে চিহ্নিত করেন। পশ্চিমের প্রথম
নারীবাদী মেরি ওলস্টোনক্রাফ্টের সঙ্গে প্রতিতুলনা করে তিনি বলেন মেরির মধ্যেও ‘এতোখানি পুরুষবিদ্বেষ ও দ্রোহিতা
দেখা যায় না' (হুমায়ুন ২০০৭: ২৮৩), যতোটা দেখা যায় রোকেয়ার মধ্যে।
নারীবাদী টেক্সট হিসেবে সুলতানার স্বপ্নের
পাঠ প্রতিষ্ঠিত। তবে এই টেক্সটের নিবিড় পাঠে নারীবাদের সাম্প্রতিক আলোচ্য দিক ‘পরিবেশ-নারীবাদে'র প্রতিফলন লক্ষ করা আমাদের উদ্দেশ্য।
৩
মানব-সভ্যতার উন্মেষ থেকে সাম্প্রতিক কাল
পর্যন্ত প্রকৃতির ওপর মানুষের আধিপত্য এবং পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারীর প্রতি পুরুষের
আধিপত্য চলমান। এতে একদিকে যেমন ধ্বংস হচ্ছে প্রকৃতি, তেমনি নারীর ওপর অন্যায়-অত্যাচার
ও নানা মাত্রিক বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে বর্তমান মানবসভ্যতা এক অসম, বৈষম্যপূর্ণ, বিকৃত ও ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির মধ্যে
রয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে নানা সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ
হয়েছেন, সমস্যার স্বরূপ তুলে ধরে এর সমাধানের পথ দেখিয়েছেন
এবং দেখিয়ে চলেছেন। নারীমুক্তি অর্থাৎ নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের সূত্রে যে
নারীবাদী আন্দোলনের সূচনা, তার বয়স প্রায় দুশো বছর। মূলত
পশ্চিমা বিশ্বে গড়ে ওঠা নারীবাদী আন্দোলন বিশ্বের বিচিত্র পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী
নানা রূপ পরিগ্রহ করলেও এই আন্দোলনের লক্ষ্য সমাজ থেকে লিঙ্গবৈষম্য দূর করা,
নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা, এবং রাষ্ট্র ও সমাজে মানুষ হিসেবে নারী-পুরুষের আত্মপরিচয় সুনিশ্চিত করা।
অপর দিকে, বিশ্বায়ন ও উন্নয়নের বিজ্ঞাপনী ফাঁদে পড়ে ক্রমাগত
ধ্বংসোন্মুখ প্রকৃতিকে রক্ষা করে প্রকৃতিবান্ধব উন্নয়ন ও মানবসভ্যতা নির্মাণের প্রেরণা
ও চিন্তা থেকে সৃষ্টি হয় ‘সবুজ আন্দোলন', অর্থাৎ পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন।
ইকোফেমিনিস্টদের মতে, প্রকৃতি ও নারীবাদীদের মধ্যে গভীর
সম্পর্ক বিদ্যমান। কারণ, উভয়ের প্রতি সৃষ্ট আগ্রাসন,
অবদমন ও সংহার-ভাবের মূলে রয়েছে পিতৃতন্ত্র। পুরুষতান্ত্রিক চিন্তন-প্রক্রিয়ায়
পুরুষের ঠিক বিপরীত কেন্দ্রে রাখা হয় নারীকে। এই চিন্তন-প্রক্রিয়ায় বিভেদ বা পার্থক্য
নির্মাণের মূল নিয়ামক নারী ও পুরুষের লিঙ্গধর্ম। এর পরিপ্রেক্ষিতেই পিতৃতান্ত্রিক
পৃথিবী প্রতিষ্ঠা ও নিয়ন্ত্রণ করে তাদের লৈঙ্গিক রাজনীতি। পিতৃতন্ত্রে পুরুষোচিত বৈশিষ্ট্যকে
প্রাধান্য দেওয়া হয়, আর নারীসুলভ বৈশিষ্ট্যকে হেয় বিবেচনা
করা হয়। শুধু তা-ই নয় মানবজীবন ও মানবসমাজ রক্ষার্থে অপরিহার্য মানুষের সহজাত ও অর্পিত
গুণাবলির মধ্যে পুরুষ ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ-সহায়ক
বৈশিষ্ট্য (যেমন—জ্ঞান, যুক্তি, সাহস প্রভৃতি) তাদের
নিজেদের বৈশিষ্ট্য, অপর দিকে ইতিবাচকতা সত্ত্বেও প্রাণ-সৃষ্টি,
লালন ও ধারণের মানবিক বৈশিষ্ট্যকে (যেমন—আবেগ, প্রেম,
মমতা, গর্ভধারণ, সন্তান লালনপালন প্রভৃতি) তারা তাদের ‘অপর'
অর্থাৎ নারীদের বৈশিষ্ট্য ও কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়েছে।
এমনকি পরিবার, সমাজ ও মানব-জীবনচক্র সম্পাদনে অপরিহার্য হলেও
এই গুণাবলিকে তারা পুরুষের গুণ বা বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে প্রতিতুলনায় ‘উন’ বা ‘অগুরুত্বপূর্ণ’ কিংবা ‘সহজ' হিসেবে চিহ্নায়নের
ধারাবাহিক প্রয়াস চালিয়ে এসেছে। আর এর মাধ্যমে নিজেদেরকে ‘সবল' ও নারীদেরকে ‘দুর্বল’
সাব্যস্ত করে তাদেরকে দমন ও পরিচালনার কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির প্রতিষ্ঠা
দিয়েছে।
নারীবাদ এবং এর সর্বশেষ বিকশিত রূপ অর্থাৎ
পরিবেশ-নারীবাদ পিতৃতান্ত্রিক এই রাজনীতিকে নারী-পুরুষ বৈষম্যের কারণ হিসেবে চিহ্নিত
করে এর অবসান চায়, এবং
এমন বিভেদের অবসানেই ভারসাম্যপূর্ণ মানবসম্পর্ক, মানবসমাজ
তথা বিশ্ব সৃষ্টি হবে—এই প্রত্যয় ব্যক্ত করে। নারী-পুরুষ সহাবস্থানের
ক্ষেত্রে এই নারীবাদ দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করে: দৃশ্যত এবং দৃশ্যের আড়ালের নানা যুক্তি ও
অবযুক্তির দ্বারা এক পক্ষকে ‘সবল' ও অপর পক্ষকে ‘দুর্বল’ চিহ্নিত করলেও সবল পক্ষ দুর্বল পক্ষকে শাসন, নিয়ন্ত্রণ
বা পরিচালনার অধিকার রাখে না। বস্তুত দুর্বল, নীরব,
নিস্ক্রিয় বিবেচনায় সবল পক্ষ যখন তা যথেচ্ছ ব্যবহার, দমন, কুক্ষিগত ও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে,
তখনই অপর পক্ষ (নারী কিংবা প্রকৃতি) নিপীড়িত বা বৈষম্যের শিকার এবং
ধ্বংসোন্মুখ হয়ে পড়ে, অর্থাৎ নারী ও প্রকৃতির প্রতি নিয়ন্ত্রণকামী
পিতৃতন্ত্রের আগ্রাসন তাদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলে। তাই পরিবেশ-নারীবাদ নারী ও
পুরুষের এমন বৈপরীত্যপূর্ণ ও সংঘাতময় পরিস্থিতির নির্মূল চায়।
ইকোফেমিনিজম শব্দটি গত শতাব্দীর সত্তরের
দশকে ফ্রাঁসোয়া দ্যুবন প্রথম ব্যবহার করেন। Barbara T Gates তাঁর 'A Root of Ecofeminism
: Ecofeminisme' প্রবন্ধে দ্যুবনকে উদ্ধৃত করে লেখেন:
…today the two most immediate
threats to survival are overpopulation and the destruction of our resources;
fewer recognize the complete responsibility of the male system, in so far it is
male (and not Capitalist or Socialist) in these two dangers; but even fewer
still have discovered that each of the two threats is the logical outcome of
one of the two parallel discoveries which gave men their power over fifty
centuries ago; their ability to plant the seed in the earth as in woman and
their participation in the act of reproduction. (Greta and Patrick 1998: 16)
প্রকৃতির বিপন্নতা, নারীর প্রতি অবদমন এবং বৈষম্যের
মাধ্যমে মানবসমাজে সৃষ্ট প্রান্তিকায়নের বিরুদ্ধে ইকোফেমিনিস্টরা সরব ও সোচ্চার। ফরাসি
দ্যুবনের মতোই চিন্তার ঐক্যে, কিন্তু স্থান-কালের ভিন্নতায়
বিশ্বের অপরাপর পরিবেশ নারীবাদীগণ তাঁদের চিন্তা, বক্তব্য
ও তর্কের মাধ্যমে এই তত্ত্বের প্রসার ঘটিয়েছেন। এই উপমহাদেশে আলোচ্য তত্ত্বের প্রবক্তা
শিবা বন্দনা। তিনি ভারতীয় কৃষিসভ্যতার সূচনাপর্বে প্রকৃতির নির্মলতা এবং নারীর কৃষিকাজের
মাধ্যমে উৎপাদন ব্যবস্থার সুসামঞ্জস্যের কথা বলেন। এক্ষেত্রে তিনি নারী ও পরিবেশের
নিপীড়নহীন অবস্থার কথাও বলেন। কিন্তু যখন এই সিস্টেম পরিচালনার ক্ষেত্রে পুরুষের আবির্ভাব
ঘটে, তখন নারী ও প্রকৃতি নিপীড়নের শিকার হতে থাকে। তাই শিবা
পরিবেশ-নারীবাদকে নতুন ধারণা হিসেবে না দেখে বরং একে ভারতবর্ষীয় পৌরাণিক তথা আদিম
সমাজের প্রাথমিক পর্যায়ের অবস্থার সঙ্গে প্রতিতুলনা করে একে 'নতুন মোড়কে প্রাচীন জ্ঞানের নতুন সূচনা' হিসেবে
দেখান; বলেন এর প্রয়োজনীয়তার কথা। বন্দনা শিবার সঙ্গে যৌথভাবে
কাজ করেন ইকোফেমিনিস্ট মারিয়া মাইজ। অস্ট্রেলীয় নৃতাত্ত্বিক ও ইকোফেমিনিস্ট ভ্যাল
প্লামউড নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে আধ্যাত্মিক নারীতত্ত্বকে বিশ্লেষণ করেন তাঁর Feminism
and the Mastery of Nature (1993) গ্রন্থে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ
নীতিবিদ্যা গবেষক ও ইকোফেমিনিস্ট ক্যারেন জে ওয়ারেন পশ্চিমা পরিপ্রেক্ষিতে ইকোফেমিনিজমের
দার্শনিক ভিত্তি প্রদান করেন Ecofeminist philosophy : A western
perspective on what it is and why it Matters (2000) গ্রন্থে। পশ্চিমা
সবুজ আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য কর্মী ইকোফেমিনিস্ট গ্রেটা গার্দ তাঁর Ecological
Politics: Ecofemists and the Greens (1998) গ্রন্থে রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে
পরিবেশ-নারীবাদ ও সবুজ আন্দোলনকে বিশ্লেষণ করেছেন। এভাবে নৃতাত্ত্বিক, আধ্যাত্মিক, সমাজতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক বিবিধ প্রেক্ষাপট থেকে দার্শনিক ভিত্তি নিয়ে পরিবেশ নারীবাদী
তত্ত্ব আজকের রূপ পরিগ্রহ করেছে, এবং ক্রমে তা শিল্প-সাহিত্যে
প্রয়োগ ও বিশ্লেষণের উপযোগিতা লাভ করেছে। যেহেতু মানবচিন্তা সবসময়ই যে কোনো তত্ত্ব
ও দর্শনের পূর্বগামী, সেহেতু এই তত্ত্বের বিকাশের পূর্বেই
রোকেয়ার চিন্তায় পরিবেশ-নারীবাদের বীজ রোপিত হয়েছিল। আর তাঁর সুলতানার স্বপ্ন গ্রন্থে
এরই প্রতিফলন লক্ষণীয়।
৪.১
পরিবেশ নারীবাদীগণ প্রত্যক্ষ করেছেন, পিতৃতন্ত্র নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে
নারী ও প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাঁরা নারী, পুরুষ ও প্রকৃতির
মধ্যকার ক্ষমতার লড়াইকে তাই দেখেন নিসর্গ-রাজনীতি জিজ্ঞাসার (ইকোপলিটিক্স) আলোকে।
প্রাণের ধারণ, লালন ও পরিচর্যার সহজাত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ক্ষমতা
ও উদ্ভাবনী শক্তির ব্যবহারে একটি ভূখণ্ডের জনগণ কেমন প্রাণবন্ত, নিরাপদ, সুখী ও সমৃদ্ধ হতে পারে, সুলতানার স্বপ্নের ‘নারীস্থান' তারই দৃষ্টান্ত। কথকের ভ্রমণসঙ্গী (তাঁর ভাষ্যে ভগিনী সারা) সংক্ষেপে নারী
পরিচালিত রাজ্যটির নাম ও পরিচালককে একটি বাক্যে তুলে ধরেন: '... এ দেশের নাম ‘নারীস্থান’, এখানে স্বয়ং পুণ্য নারীবেশে রাজত্ব করেন' (বেগম
রোকেয়া ২০০৬: ১০৩)। স্মর্তব্য, পাপের বিপরীতার্থবোধক শব্দ
'পুণ্য'। শব্দটির মানে ‘সৎকর্ম’। কথক সুলতানা বর্ণিত নগরের দৃশ্যাবলি দেখে
বিমোহিত হয়েছেন। তাঁর ভাষায়:
ক্রমে নগরের দৃশ্যাবলী দেখিয়া
আমি অন্যমনস্ক হইলাম। বাস্তবিক পথের উভয় পার্শ্বস্থিত দৃশ্য অতিশয় রমণীয় ছিল। সুনীল
অম্বর দর্শনে মনে হইল যেন ইতিপূর্বে আর কখন এত পরিষ্কার আকাশ দেখি নাই। একটি তৃণাচ্ছাদিত
প্রান্তর দেখিয়া ভ্রম হইল, যেন হরিৎ মখমলের গালিচা পাতা রহিয়াছে। ভ্রমণ কালে আমার বোধ হইতেছিল,
যেন কোমল মনদের উপর বেড়াইতেছি,–ভূমির দিকে
দৃকপাত করিয়া দেখি, পথটি শৈবাল ও বিবিধ পুষ্পে আবৃত। আমি
তখন সানন্দে বলিয়া উঠিলাম, 'আহা! কি সুন্দর।'
ভগিনী সারা জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘আপনি এ সব পছন্দ করেন কি?'
...
‘হাঁ এসব দেখিতে বড়ই চমৎকার। কিন্তু আমি এ সুকুমার কুসুমস্তবক পদদলিত করিতে
চাই না।'
‘সে জন্য ভাবিবেন না, প্রিয় সুলতানা! আপনার পদস্পর্শে এ ফুলের কোন ক্ষতি হইবে না। এগুলো বিশেষ
এক জাতীয় ফুল, ইহা রাজপথেই রোপন করা হয়।' (বেগম রোকেয়া ২০০৬ : ১০৩)
অর্থাৎ প্রকৃতির সামান্যতম বিকৃতি বা ধ্বংস
না করে নারীস্থানের রাজপথের ঘাসবৎ ফুলগাছ রোপিত হয়েছে। নগরীর সবুজায়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনে
এমন সযত্ন পরিকল্পনা ও পরিচর্যা নারীস্থানের পরিচালক, কর্মী ও অধিবাসীদের সবুজ বিপ্লবের
চিন্তাপ্রসূত—তাত্ত্বিকভাবে যে আন্দোলন দানা বেঁধেছিল
এই টেক্সট রচনার অনেক পরে। নারীস্থানের ‘উদ্যানরচনা-নৈপুণ্য' দেখে প্রশংসা করেছেন কথক সুলতানা,
প্রকারান্তরে এই কল্পনা করেছেন লেখক রোকেয়া। ‘প্রকৃতি-রানির লীলাকানন' যে নারীস্থান,
সুলতানার ভাষ্যে—‘ভারতবাসী ইচ্ছা করিলে কলিকাতাকে ইহা অপেক্ষা
অধিক সুন্দর পুষ্পোদ্যানে পরিণত করিতে পারেন'
(বেগম রোকেয়া ২০০৬: ১০৪)। কিন্তু ভারতবর্ষের নীতিনির্ধারক ও পরিবেশচিন্তকদের
এমন সুন্দর কল্পনা ও সদিচ্ছার বিষয়ে উদ্যোগহীনতার কথা সুলতানা ও তার ভ্রমণসঙ্গী সারার
আলাপচারিতায় উঠে এসেছে। নারীস্থানের এই সবুজ বিন্যাস প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে
লিবারেল নারীবাদীদের অভিমত। তাঁরা মনে করেন, 'যে কোন ধরনের
উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ রক্ষায় নারীই প্রধান ভূমিকা নেয়। পরিবেশ সংরক্ষণে নারীই
সাহায্য করে।' (বিপ্লব ২০০৯: ১৯)
৪.২
পরিবেশ-নারীবাদ নারী-পুরুষের ভারসাম্যপূর্ণ
ও সহাবস্থানমূলক সম্পর্কে বিশ্বাসী। তাই জৈবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে শারীরিক বলপ্রয়োগের
মাধ্যমে 'পুরুষ'
তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার যে অব্যাহত প্রচেষ্টা প্রথাগত
সম্পর্ক পরিবার ও সমাজে জারি রাখে, পরিবেশ নারীবাদীরা এর অবসান
চান। তাঁরা মনে করেন, শারীরিক বলে বলীয়ান হলেই কেউ শারীরিকভাবে
বলহীন বা দুর্বলকে পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণের অধিকার রাখে না। অপরাপর ধারার নারীবাদীদের
বক্তব্যও এক্ষেত্রে অনুরূপ। পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়িত্বের ফলে নারীজীবনের
নানা দুর্ভোগের ফলে র্যাডিক্যাল নারীবাদী ম্যারি ড্যালি মনে করেন, ‘সমাজে পুরুষদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম হলে ভালো হয়' (বিপ্লব ২০০৯: ৬৬)। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় লৈঙ্গিক রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে
একজন অস্তিত্ববাদী দার্শনিক হিসেবে সিমোন দ্য বোভোয়া তাঁর দ্য সেকেন্ড সেক্স (১৯৪৯)
গ্রন্থে বলেছিলেন: 'কেউ নারী হয়ে জন্মায় না, নারী হয়ে ওঠে।' পিতৃতান্ত্রিক সমাজে 'আমরা' হলো পুরুষ, আর নারীরা
তাদের ‘অপর’। বোভোয়ার মতে:
নারীকে এই 'অপর' করে
তোলা সমাজ-নির্মিত। ঐতিহাসিকভাবে নারীকে এক অস্বাভাবিক অন্যায় পরিস্থিতির মধ্যে বেঁধে
রাখা হয়েছে। মেয়েরা নিজেরাও বুঝতে পারে না স্বাভাবিক অবস্থা থেকে তাদের বিচ্যুত করে
রাখা হয়েছে। এ সমাজে নারীরা যেন আউটসাইডার। নারীবাদী আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে
হলে এ ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি থেকে নারীদের মুক্তি চাই। (বিপ্লব ২০০৯: ৬৭)
ভারতবর্ষের পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পুরুষ
আধিপত্য ও কর্তৃত্বের চরম প্রকাশে নারীদের অবদমিত, নির্যাতিত ও অনিরাপদ হবার বাস্তবতায় ম্যারি ড্যালির
মতো নারীস্থানের নারীরাও মনে করেন, নারীদের নিরাপত্তার জন্য
পুরুষদের অন্তঃপুরে রাখা উচিত। শারীরিকভাবে পুরুষ অপেক্ষা নারী দুর্বল হওয়ায় ভারতবর্ষীয়
সমাজব্যবস্থায় পুরুষগণ নারীদেরকে অন্তঃপুরে রাখার বিধান করেছে। অথচ এটি অবদমনমূলক
ও অমানবিক আচরণ। সুলতানা ও সারার এ প্রসঙ্গে আলাপ উদ্ধৃত করা যাক:
...কোন বন্য জন্তু কোন একটা
গ্রামে আসিয়া পড়িলেও তো সে গ্রামখানি নিরাপদ থাকে না। কি বলেন?
‘তাহা ঠিক; হিংস্র জন্তুটা ধরা না পড়া পর্য্যন্ত গ্রামটি নিরাপদ হইতে পারে না।'
…
'কিন্তু কাৰ্য্যতঃ আপনাদের দেশে আমরা
ইহাই দেখিতে পাই! পুরুষেরা—যাহারা নানা প্রকার দুষ্টামী করে, বা অন্ততঃ করিতে সক্ষম, তাহারা দিব্য স্বাধীনতা ভোগ করে, আর নিরীহ কোমলাঙ্গী
অবলারা বন্দিনী থাকে! অশিক্ষিত অমার্জিতরুচি পুরুষেরা বিনা শৃঙ্খলে থাকিবার উপযুক্ত
নহে। আপনারা কিরূপে তাহাদিগকে মুক্তি দিয়া নিশ্চিন্ত থাকেন?' (বেগম রোকেয়া ২০০৬ : ১০৫ )
এবার কথক সুলতানা আসেন স্বদেশের পিতৃতান্ত্রিক
সমাজব্যবস্থায় পুরুষ কর্তৃক নারীকে অবদমন নির্যাতন এবং মানবাধিকার হরণের প্রকৃত রূপ
দর্শাতে:
জানেন, ভগিনী সারা! সামাজিক বিধিব্যবস্থার
উপর আমাদের কোন হাত নাই। ভারতে পুরুষজাতি প্রভু,—তাহারা সমুদয়
সুখ সুবিধা ও প্রভুত্ব আপনাদের জন্য হস্তগত করিয়া ফেলিয়াছে, আর সরলা অবলাকে অন্তঃপুর রূপ পিঞ্জরে আবদ্ধ রাখিয়াছে! উড়িতে শিখিবার পূর্ব্বেই
আমাদের ডানা কাটিয়া দেওয়া হয়—তদ্ব্যতীত সামাজিক রীতিনীতির কত শত কঠিন
শৃঙ্খল পদে পদে জড়াইয়া আছে। (বেগম রোকেয়া ২০০৬: ১০৫)
এই উদ্ধৃতিতে নারীর দীর্ঘশ্বাসময় দুর্দশাগাথা
যেমন প্রকাশিত, অপর পক্ষে
পুরুষের প্রভু ও নিয়ন্তা হবার সুবিধা ও সুবিধাভোগী অবস্থানের চিত্র পরিষ্কারভাবে উঠে
এসেছে। আর এই ব্যবস্থায় পুরুষ সুবিধাভোগী হবার পক্ষে পুরুষের যুক্তি—তারা শারীরিকভাবে বলীয়ান! সুলতানার ভাষ্যে—‘জোর যার মুলুক তার; যাহার বল বেশী, সেই স্বামিত্ব করিবে ইহা অনিবার্য্য'
(বেগম রোকেয়া ২০০৬: ১০৫)। আর এর বিপরীতে সারার ক্ষুরধার যুক্তি:
কেবল শারীরিক বল বেশী হইলেই
কেহ প্রভুত্ব করিবে, ইহা আমরা স্বীকার করি না। সিংহ কি বলে বিক্রমে মানবাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ নহে?
তাই বলিয়া কি কেশরী মানবজাতির উপর প্রভুত্ব করিবে? (বেগম রোকেয়া ২০০৬: ১০৫)
স্পষ্টতই এই যুক্তি পরিবেশ নারীবাদীদেরও।
ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ, সম্পর্ক ও পৃথিবীর নির্মাণে পিতৃতন্ত্র যুগ যুগ ধরে তাদের জৈবিক তথা শারীরিক
শক্তিকে অস্ত্ররূপে ব্যবহার করে আসছে। আর নারীবাদীরা বিশেষত পরিবেশ নারীবাদীরা একে
অসাম্যের কারণ চিহ্নিত করে এর অবসান চেয়ে আসছেন। অর্থাৎ তত্ত্বীয়ভাবে ইকোফেমিনিস্টদের
যে বক্তব্য জোরালো হয়েছে ১৯৭০ সালের পর, রোকেয়া সেই যুক্তি
তাঁর রচনায় প্রয়োগ করেছেন ১৯০৫ সালে। এখানেই ইকোফেমিনিজমের আদি প্রবক্তাদের একজন
হয়ে উঠেছেন সুলতানার স্বপ্নের লেখক।
৪.৩
রোকেয়ার কল্পিত নারীস্থানে মহামারী, শিশুমৃত্যু, দুর্ভিক্ষ নেই। কারণ দারিদ্র্য, বৈষম্য,
অব্যবস্থাপনা, অন্নাভাব, চিকিৎসাহীনতা ও সম্পদের সদ্ব্যবহারের অভাবে এগুলো ঘটে। তুলনামূলকভাবে অনুন্নত
রাষ্ট্রের নারীবাদীগণ গত শতাব্দীর শেষ দিকে এসব ব্যাপার গবেষণা- অনুসন্ধানের মাধ্যমে
ব্যাপকভাবে তুলে ধরেন। এখানেও রোকেয়ার চিন্তা বর্ণিত চিন্তকদের তুলনায় অগ্রবর্তী।
নারীস্থানে এসে ভ্রমণসঙ্গী সারার কাছ থেকে সুলতানা শুনলেন:
তাঁহাদের নারীস্থান কখনো
মহামারী রোগে আক্রান্ত হয় না। আর তাঁহারা আমাদের ন্যায় হুলধর মশার দংশনেও অধীর হন
না! বিশেষ একটি কথা শুনিয়া আমি অত্যন্ত বিস্মিত হইলাম,—নারীস্থানে নাকি কাহারও অকাল-মৃত্যু
হয় না। তবে বিশেষ কোন দুর্ঘটনা হইলে লোকে অপ্রাপ্ত বয়সে মরে, সে স্বতন্ত্র কথা। ভগিনী সারা আবার হিন্দুস্থানের অসংখ্য শিশুর মৃত্যু সংবাদে
অবাক হইলেন। তাঁহার মতে যেন এই ঘটনা সর্ব্বাপেক্ষা অসম্ভব। ...
ভারতের প্লেগ সম্বন্ধেও অনেক কথা হইল; তিনি বলিলেন, ‘প্লেগ টেলেগ কিছুই নহে— কেবল দুর্ভিক্ষপীড়িত লোকেরা নানা
রোগের আধার হইয়া পড়ে। একটু অনুধাবন করিলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, গ্রাম অপেক্ষা নগরে প্লেগ বেশী,—নগরের ধনী অপেক্ষা
নির্ধনের ঘরে প্লেগ বেশী হয়, এবং প্লেগে দরিদ্র পুরুষ অপেক্ষা
দরিদ্র রমণী অধিক মারা যায়। সুতরাং বেশ বুঝা যায়, প্লেগের
মূল কোথায়—মূল কারণ ঐ অন্নাভাব। আমাদের এখানে প্লেগ
ম্যালেরিয়া আসুক তো দেখি!”
তাই তো, ধনধান্যপূর্ণা নারীস্থানে ম্যালেরিয়া কিম্বা প্লেগের
অত্যাচার হইবে কেন? প্লীহা- স্ফীত উদর ম্যালেরিয়াক্লিষ্ট
বাঙ্গালায় দরিদ্রদিগের অবস্থা স্মরণ করিয়া আমি নীরবে দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিলাম।
(বেগম রোকেয়া ২০০৬: ১০৬-১০৭)
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে অর্থনৈতিক নাজুকতায়
বাংলায় দুর্ভিক্ষ-মহামারি দারিদ্র্য একদিকে,
অপর দিকে পিতৃতান্ত্রিক পরিবার-কাঠামোয় নারীর প্রান্তিকায়ন। এর
অনিবার্য নেতি-প্রভাব এসে পড়েছিল তৎকালীন সমাজের নারী, শিশু
ও বৃদ্ধদের স্বাস্থ্যে। ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বেড়ে গিয়েছিল নারী ও শিশুমৃত্যুর
হার। অর্থাৎ অনুন্নত দেশ হিসেবে রোকেয়ার দেখা বাংলায় সংকটকে তীব্রতর করেছিল ‘উন্নত' তথা সবল অর্থনীতির রাষ্ট্র ব্রিটেনের ঔপনেবিশিক
শাসন ও শোষণ। পরিবেশ নারীবাদীগণ—
… প্রকৃতি ধ্বংসের
সঙ্গে মেয়েদের ওপর পুরুষ প্রধান সমাজের প্রভুত্বের (শিশু, কালো মানুষ ও প্রান্তিক মানুষদের ওপরেও) সম্পর্ক খুঁজে পান। গবেষণা ও অনুসন্ধানে
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা দেখতে পান—স্বাস্থ্য সম্পর্কিত নানা risk factors বৈষম্যমূলকভাবে মেয়ে
শিশু, বর্ণ ও জাতিগতভাবে সমাজের নিম্নস্তরের ও প্রান্তিক শিশু
এবং গরিব শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। এর Low-level radiation-এর শিকার হয়, নানা পেস্টিসাইড ও টক্সিকস- এর শিকার
হওয়া ছাড়াও দূষণের শিকার হয়। বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা গেছে প্রথম বিশ্বের উন্নয়ন
ও শিল্পায়ন সম্পর্কিত নানা নীতিসমূহের ফলে নারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সবচেয়ে বেশি।
বিশেষত খাবার দাবার, অরণ্য ও জল—মানবিক অধিকার হিশেবে পাওয়ার ক্ষেত্রে। (বিপ্লব ২০০৯ : ২৩)
ইকোফেমিনিস্টদের গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্ত-বিবরণী
সংবলিত এই উদ্ধৃতাংশের সঙ্গে সুলতানার স্বপ্ন থেকে চয়নিত অব্যবহিত পূর্বের উদ্ধৃতাংশের
যোগাযোগ অত্যন্ত নিবিড়। পার্থক্য শুধু এখানে, ইকোফেমিনিস্টরা বলেছেন উন্নত রাষ্ট্রের উৎপাদন ও উন্নয়ন
নীতিমালার কথা, আর রোকেয়া বলেছেন সেসব রাষ্ট্রের ঔপনিবেশিক
আগ্রাসনের ফলাফলের কথা। এক্ষেত্রে স্মরণ করা যেতে পারে, ঔপনিবেশিক
আমলে এই উপমহাদেশের কৃষকগণ তাঁদের খোরাকি- শস্য চাষাবাদের পরিবর্তে বাধ্য হয়ে শাসকের
বিলাসি দ্রব্যের জোগান দিতে নীল চাষ করতেন। উন্নত রাষ্ট্রসমূহে চর্চিত নারীবাদ ও অনুন্নত
রাষ্ট্রসমূহে চর্চিত নারীবাদের ধরন, সমস্যা ও বক্তব্য বিষয়ে
ইকোফেমিনিজম উৎপাদন-উন্নয়ন ও পিতৃতন্ত্রের ভাষ্যগত যে তারতম্য চিহ্নিত করে,
রোকেয়ার এই টেক্সটে এর প্রতিফলন আলোচ্য উদ্ধৃতিতে সংক্ষেপে সারবত্তাসহ
প্রকাশিত।
৪.৪
সুলতানার স্বপ্নের নারীস্থানের আবাস ও অবকাঠামো
পরিবেশবান্ধব ও সবুজ। ব্যবহার উপযোগিতায় এসব অবকাঠামো যেমন প্রকৃতিলগ্ন ও স্বাস্থ্যকর, তেমনি নৈপুণ্য ও নান্দনিকতায় চমৎকার।
সুলতানার ভ্রমণসঙ্গী সারার গৃহ সম্পর্কে টেক্সটে বর্ণিত রয়েছে:
বাড়ীখানি একটি বৃক্ষ হৃদয়াকৃতি
উদ্যানের মধ্যস্থলে অবস্থিত। ভাবটি কি চমৎকার!—ধরিত্রী জননীর হৃদয়ে মানবের বাসভবন! বাড়ী বলিতে,
একটি টীনের বাঙ্গালা মাত্র, কিন্তু সৌন্দর্য্যে
ও নৈপুণ্যে ইহার নিকট আমাদের দেশের বড় বড় রাজপ্রাসাদ পরাজিত! সাজ সজ্জা কেমন নয়নাভিরাম
ছিল, তা ভাষায় বর্ণনীয় নহে—তাহা কেবল দেখিবার জিনিস! (বেগম রোকেয়া ২০০৬ : ১০৬)
আর সারার রান্নাঘরের বর্ণনা সুলতানার ভাষ্যে
:
... একি রন্ধন-গৃহ না নন্দন
কানন? রন্ধনশালার চতুর্দিকে
মনোরম সবজী বাগান এবং নানারকম তরিতরকারীর লতাগুল্মে পরিপূর্ণ। ঘরের ভিতর ধূম বা ইন্ধনের
কোন চিহ্ন নাই,–মেজেখানি অমল ধবল মর্ম্মর প্রান্তর-নির্মিত,
মুক্ত বাতায়নগুলি সদ্য প্রস্ফুটিত পুষ্পদামে সুসজ্জিত। (বেগম রোকেয়া
২০০৬ : ১০৭)
অর্থাৎ অট্টালিকা নয়, সুসজ্জিত বাংলোসদৃশ বাসভবন আর নিজেদের
খাদ্যের সংস্থান- উপযোগী সবজি বাগানসহ স্বাস্থ্যকর ও পরিচ্ছন্ন রন্ধনশালা নারীস্থানের
অধিবাসীদের। আর মুক্ত জানালাযুক্ত রন্ধনশালার মেঝে পর্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও ধোঁয়ামুক্ত।
কার্বন নিঃসরণমুক্ত ও চারপাশের প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, মানব-স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, এবং চোখের ও মনের
জন্য প্রশান্তিদায়ক গৃহ-অবকাঠামো অধুনা পরিবেশবাদীদের প্রস্তাবিত নির্মাণকলা। আর এতে
এসব গৃহের অধিবাসী বিশেষত নারীদের দীর্ঘক্ষণ বিচরণস্থান রন্ধনশালা বিরক্তি উদ্রেককারী
না হয়ে, হয়ে উঠেছে অনেকটা আরাধ্য। মূলত বাস্তবে যা লেখকের
পরিপার্শ্বে নেই বা ছিল না, কল্পনায় তা-ই নির্মাণের মাধ্যমে
লেখক তাঁর মনোবাসনার উন্মুক্ত পরিসর সৃষ্টি করেছেন। এটি অসম্ভব নয়, সম্ভবপর।
৪.৫
রোকেয়ার সুলতানার স্বপ্ন একটি ‘বৈজ্ঞানিক ইউটোপিয়া'। মানবজীবন, বিশেষত নারীজীবনকে সহজ, নির্বিঘ্ন ও কল্যাণকর উদ্ভাবনী জ্ঞানলগ্ন রাখার প্রয়াসে রোকেয়ার সুলতানা
অনেকগুলো বৈজ্ঞানিক পন্থার কথা এই টেক্সটে বয়ান করেছেন। বাল্যকাল থেকেই বিজ্ঞানচর্চা
করতে পছন্দ করা রানি নারীস্থানের। তিনি রাজ্যের সব নারীর সুশিক্ষা ও বিজ্ঞানচর্চায়
আত্মনিয়োগ চান। আর এই সদিচ্ছার ফলেই নারীস্থান হয়ে উঠেছিল বৈজ্ঞানিক নানা আবিষ্কারের
প্রয়োগে আধুনিক। নারীস্থানের নারীরা লাকড়ির মাধ্যমে পরিবেশের ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য
ক্ষতিকর উপায়ে ধোঁয়া সৃষ্টির মাধ্যমে রন্ধনকর্ম সম্পাদন করেন না, তাঁরা রান্না করেন সৌরতাপে, অর্থাৎ সৌরবিদ্যুতের
সাহায্যে। সৌরকোষ আবিষ্কৃত হলেও রন্ধনকাজে এর ব্যবহার রোকেয়ার আলোচ্য টেক্সট রচনাকালে
শুরু হয়নি। সারার কাছ থেকে সুলতানা সূর্যোত্তাপে রান্নার কৌশল জেনেছিলেন। লেখক জানান:
তিনি বলিলেন, 'সূর্য্যোত্তাপে রান্না হয়।'
অতঃপর কি প্রকারে সৌরকর একটা নলের ভিতর দিয়া আইসে, সেই নলটা তিনি আমাকে দেখাইলেন। কেবল ইহাই নহে; তিনি তৎক্ষণাৎ এক পাত্র ব্যঞ্জন (যাহা পূর্ব্ব হইতে তথায় রন্ধনের নিমিত্ত
প্রস্তুত ছিল) রাঁধিয়া আমাকে সেই অদ্ভুত রন্ধন প্রণালী দেখাইলেন। (বেগম রোকেয়া ২০০৬:
১০৭)
বিশ শতকের প্রথম দশকের বিবেচনায় ‘অদ্ভুত'ই
বটে এই প্রক্রিয়া। ভ্রমণসঙ্গী সারার মুখে সুলতানা নারীস্থানের নারী বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত
এক যন্ত্রের গল্পও শোনেন, যার মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে সূর্যোত্তাপ
সংগ্রহ ও মজুদ করে পরে প্রয়োজন অনুসারে বিতরণও করতে পারেন তাঁরা।
নারীস্থানের বিজ্ঞানীবর্গ প্রকৃতির উপকরণকে
বিজ্ঞানচর্চার উৎকর্ষে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলার নানাবিধ কৌশল আয়ত্ত করেছেন। সূর্যোত্তাপ
সংগ্রহ এবং রন্ধনকাজে এই তাপের ব্যবহার কেবল নয়, ঝড়-বৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক ঘটনাকে বৈজ্ঞানিক কৌশলের
প্রয়োগে নিয়ন্ত্রণ করতেও পারেন তাঁরা। নারীস্থানের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিলা প্রিন্সিপাল
কর্তৃক অভিনব বেলুন নির্মাণের কথাও সুলতানা জানতে পারেন। এই বেলুনের ব্যবহার সম্পর্কে
সুলতানার ভাষ্য:
... বেলুনে কতকগুলি নল সংযোগ
করা হইল। বেলুনটি শূন্যে মেঘের উপর স্থান করা গেল—বায়ুর আর্দ্রতা ঐ বেলুনে সংগ্রহ করিবার
উপায় ছিল,–এইরূপে জলধরকে
ফাঁকি দিয়া তাঁহারা বৃষ্টিজল করায়ত্ত করিলেন! বিদ্যালয়ের লোকেরা সর্বদা ঐ বেলুনের
সাহায্যে জল গ্রহণ করিত কি না, তাই আর মেঘমালায় আকাশ আচ্ছন্ন
হইতে পারিত না। এই অদ্ভুত উপায়ে বুদ্ধিমতী লেডী প্রিন্সিপাল প্রাকৃতিক ঝড় বৃষ্টি
নিবারণ করিলেন। (বেগম রোকেয়া ২০০৬: ১০৮)
উল্লেখ্য, আমেরিকান রসায়নবিদ ও আবহাওয়াবিদ ভিনসেন্ট শেফার (১৯০৬-১৯৯৩)
এবং মার্কিন রসায়নবিদ ও পদার্থবিদ আরভিঙ ল্যাংমুর রাসায়নিক উপাদানের সহায়তায় কৃত্রিম
বৃষ্টিপাতের উপায় আবিষ্কার করেন। শেফার ক্লাউড সিডিং তৈরি করেছিলেন ১৯৪৬ সালে,
আর ১৯০৫ অর্থাৎ আরো প্রায় চার দশক পূর্বে রোকেয়া কল্পনা করেছিলেন
বেলুনে মেঘ ধরে ঝড়-বৃষ্টি নিবারণ বিষয়ে।
পদার্থবিদ্যা ও রসায়নবিদ্যার আরো প্রায়োগিক
দিক সম্পর্কে এই টেক্সটে বলা হয়েছে। নারীস্থান সুলতানার চোখে স্বর্গরাজ্যবৎ। তাই এর
রানিকে দেখার ইচ্ছে তাঁর। আর রানির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য তাঁকে চড়তে হয় সে রাজ্যের
বিশেষ বাহন বায়ুযানে। এই যানের নির্মাণে ‘উৎকৃষ্ট রৌপ্য’ ব্যবহার হয়েছে বলে সুলতানার প্রতীতি
জন্মে। বায়ুযানের বর্ণনায় সুলতানা জানিয়েছেন:
দেখিলাম ঐ চক্চকে গোলার ছোট
বড় দুইটি গোলা এই তক্তায় সংযোগ করা হইল। আমি প্রশ্ন করিয়া জানিলাম সে গোলা হাইড্রোজেন
পূর্ণ। তাহারই সাহায্যে আমরা শূন্যে উত্থিত হইব। বিভিন্ন ওজনের বস্তু উত্তোলনের নিমিত্ত
ছোট বড় বিবিধ ওজনের হাইড্রোজোনের গোলা ব্যবহৃত হয়। ... এই অপরূপ বায়ুযানে দুইটি
পাখার মত ফলা সংযুক্ত হইল, শুনিলাম ইহা বিদ্যুৎ দ্বারা পরিচালিত হয়। আমরা উভয়ে আসনে উপবেশন করিলে
পর তিনি (সারা) ঐ পাখার কল টিপিলেন। প্রথমে আমাদের ‘তখতে রওয়াঁ'
খানি ধীরে ধীরে ৭/৮ হাত ঊর্দ্ধে উত্থিত হইল, তার পর বায়ুভরে উড়িয়া চলিল! (বেগম রোকেয়া ২০০৬: ১১৫-১১৬)
এই তথ্য প্রায় সবার জানা যে, মার্কিন প্রকৌশলী রাইট ভ্রাতৃদ্বয়
অরভিল রাইট (১৮৭১- ১৯৪৮) ও উইলবার রাইটের (১৮৬৭-১৯১২) নিরন্তর প্রচেষ্টায় ১৯০৩ সালে
উড়োজাহাজ আবিষ্কৃত হয়। বাস্তবে উড়োজাহাজে রোকেয়াও চড়েছিলেন; তবে তা এই টেক্সট রচনার বেশ পরের ঘটনা।
নারীস্থানের নারীরা ধ্বংস ও প্রাণনাশের মাধ্যমে
যুদ্ধে জয়ী হন না। তাঁরা বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের প্রয়োগে সুকৌশলে যুদ্ধজয়ী হয়ে বহিঃশত্রুর
আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষাও করতে পারেন। অর্থাৎ প্রাণ ও প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত বা সংঘর্ষ
নয়, বৌদ্ধিক জীব হিসেবে
সর্বক্ষেত্রে জ্ঞান- বিজ্ঞানের ব্যবহার করে সুখ ও শান্তি বজায় রাখেন তাঁরা।
৪.৬
রোকেয়ার নারীস্থান কি শুধু নারীদের আবাস? – তা নয়। এখানে পুরুষও বাস করেন।
তাহলে তাদের ভূমিকা কী?—তাঁদের ভূমিকা এখানে বর্ণিত হয়েছে
নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী কার্যপরিধির মধ্যে। নারীস্থানের পুরুষ অধিবাসীদের অবস্থান
গৃহে। তাঁদের সক্ষমতা অনুযায়ী এখানে তাঁরা কাজও করেন। নারীরা যখন বিজ্ঞানচর্চা করছেন,
গবেষণা করছেন, তখন তাঁরা দেশের উন্নয়নের
জন্য যে কায়িক শ্রমের প্রয়োজন, সেগুলো সম্পাদন করেন। সুলতানার
প্রশ্নে জিজ্ঞাসিত হয়ে সারা নারীস্থানের পুরুষের কার্যাবলি সম্পর্কে জানান: ‘বড় বড় কলকারখানায় যন্ত্রাদি পরিচালিত করেন; খাতা-পত্র রাখেন,—এক কথায় বলি, তাঁহারা যাবতীয় কঠিন পরিশ্রম অর্থাৎ যে কার্য্যে কায়িক বলের প্রয়োজন,
সেই সব কার্য্য করেন' (বেগম রোকেয়া ২০০৬:
১১৪)। সারা আরো জানান, নারীস্থানের পুরুষেরা বিদ্যা,
বুদ্ধি, সুশিক্ষায় নারীদের চেয়ে 'হীন' নয়। মূলত এখানকার নারী পুরুষগণ নিজেদের ‘শ্রম বণ্টন’ করে নিয়েছেন। এই বণ্টিত শ্রমে নারীরা
মস্তিষ্কচালনা করেন, আর পুরুষেরা করেন শারীরিক পরিশ্রম। এখানে
নারীরা যেসব যন্ত্রের উদ্ভাবন বা সৃষ্টির কল্পনা করেন, পুরুষেরা
তা নির্মাণ করেন। সারার ভাষায়: ‘নরনারী উভয়ে একই সমাজ দেহের
বিভিন্ন অঙ্গ,—পুরুষ শরীর, নারী মন!'
(বেগম রোকেয়া ২০০৬: ১১৪)। সর্বোপরি নারী-পুরুষের সম্পর্ক ও কর্মের
সহাবস্থানমূলক দৃষ্টান্ত নারীস্থানে রচিত হয়েছে। এখানে নর-নারীর সম্পর্ক ও কর্তব্য
নির্ভরতাপূর্ণ, ভারসাম্যমূলক—পরিবেশ-নারীবাদের উদ্দিষ্ট যেমন।
৫
ইকোফেমিনিজমের আলোকে উপর্যুক্ত আলোচনা ও
বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, সুলতানার স্বপ্ন গ্রন্থটিতে:
১. নারীর বৌদ্ধিক অবস্থা
ও অবস্থানের ক্ষেত্রে প্রচলিত (পিতৃতান্ত্রিক) পুরুষ-বয়ানকে নস্যাৎ করে এর বিপরীত
বয়ান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
২. শারীরিক ও জৈবিক শক্তিগত
পুরুষ-প্রাধান্যের প্রচলিত ডিসকোর্সকে ভেঙে নতুন পালটা ডিসকোর্স সৃষ্টি করা হয়েছে।
৩. বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও উদ্ভাবন
পরিবেশের কোনোরূপ ক্ষতি না ঘটিয়ে কীভাবে রাষ্ট্রের কৃষি, যানবাহন, অবকাঠামো এবং নগর-বিন্যাসে সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে সহজ, উন্নত, সমৃদ্ধ ও সুন্দর করা যায় এর নমুনা ‘নারীস্থান’কে উপলক্ষ্য করে দেখানো হয়েছে।
তাত্ত্বিক কুলজি সন্ধান না করেই এই টেক্সটের
রচয়িতার অভিনব চিন্তার প্রশংসা করে ১৩২৮ বঙ্গাব্দের মাঘে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য
পত্রিকার ‘গ্রন্থ পরিচয়'
বিভাগে লেখা হয়:
... সংসারে নারী যে পুরুষের
প্রাধান্য না মানিয়াও স্বচ্ছন্দে বিচরণ করিতে পারে, জ্ঞান ও বিজ্ঞানের অনুশীলনে কৃতিত্ব দেখাইতে পারে,
এমনকি বিদেশীর আক্রমণ হইতে স্বদেশের গৌরব রক্ষা করিতে পারে,
তাহাই লেখিকা দেখাইছেন। আমরা ভরসা করি, ইংরাজী
শিক্ষিত মুসলমান সমাজে এই পুস্তকের আদর হইবে। (উদ্ধৃত, বেগম
রোকেয়া ২০০৬: ৫৯৯)
টেক্সটের বিষয়বস্তুগত কারণে ‘ইংরাজী শিক্ষিত' অর্থাৎ আধুনিক মুসলমান সমাজে যে পুস্তকের গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টির কথা বলা
হয়েছিল, সেই আধুনিকত্ব বাংলাদেশে এখনো সুদূরপরাহত। কারণ পিতৃতন্ত্রের
বিধিবদ্ধতায় কেবল বাংলার নারী নয়, পৃথিবীর সর্বত্রই নারীর
জীবনে বিশেষত বৌদ্ধিক বিচরণের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত স্বাচ্ছন্দ্য আসেনি। তবে কীভাবে তা
আসতে পারে, গভীর কল্পনা তথা স্বপ্নে সুলতানারূপী রোকেয়া পুরুষকে
কার্যত অন্তঃপুরবাসী এবং নারীকে কেন্দ্র-চালিকাশক্তি, নিয়ন্ত্রণকারী
এবং নিরাপদ বিচরণকারী হিসেবে চিত্রায়ণ করে এই টেক্সটে তুলে ধরেছেন। আর এই ব্যবস্থাকে
সারা তথা নারীস্থানের অধিবাসীগণ ‘জেনানা'র আদলে চিহ্নিত করেছেন ‘মৰ্দ্দানা' নামে।
৬
নিজের সমকাল থেকে অনেক বেশি অগ্রগামী চিন্তক
রোকেয়া তাঁর সুলতানার স্বপ্নে সুতীক্ষ্ণ দূরদৃষ্টির সাহায্যে ভবিষ্যৎ নারীজীবনের দৃশ্যপট
এঁকেছেন। প্রায় সোয়া এক শতাব্দ পূর্বের ভাবনাজাত বৈজ্ঞানিক এই ইউটোপিয়ার যুক্তি, বাস্তবতা ও বর্তমান তাত্ত্বিক প্রকল্পের
আওতায় এর পাঠ পাঠক-গবেষকদের কাছে আগ্রহ-উদ্দীপক, বিশ্লেষণযোগ্য
ও প্রয়োগসম্ভবপর বলে প্রতিভাত। পুরুষ-আধিপত্যমূলক যে ন্যারেটিভ পুরুষের কলমে ও গ্রহণে
এ যাবৎকাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, শতাব্দ পূর্বেই এর বাইনারি-ন্যারেটিভ
রোকেয়া তৈরি করেছিলেন। তাই তাঁর এই ভাবনা ও সৃষ্টি পুরাতন হলেও সাবেক নয়,
বরং তা যথার্থ অর্থেই সাম্প্রতিক। পরিবেশ- নারীবাদের আলোকে এই টেক্সটের
বর্তমান বিশ্লেষণ অন্তত এটিই প্রমাণ করে।
টীকা
১. সুলতানার স্বপ্ন এতদিন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি
হিসেবেই পঠিত হয়েছে। ২০২৪ সালে রচনাটি ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড মেমোরিতেও নারীরচিত ইউটোপীয়
নভেল হিসেবে স্থান পেয়েছে। ইংরেজি ভাষায় Sultana's
Dream প্রথম প্রকাশিত হয় মাদ্রাজের 'দ্য
ইন্ডিয়ান লেডিজ' ম্যাগাজিনে ১৯০৫ সালে। আর এটি গ্রন্থাকারে
প্রকাশিত হয় ১৯০৮ সালে। ১৯২২ সালে ইংরেজি থেকে স্বয়ং লেখকই এর বঙ্গানুবাদ করেন সুলতানার
স্বপ্ন নাম দিয়ে। নারীদের ভাবিত ও নারীদের দ্বারা পরিচালিত, এবং পুরুষদের অন্তঃপুরবাসী করে রাখা—এই গ্রন্থে বর্ণিত দেশের প্রথা। আর এই প্রথাকে দেশবাসীগণ ‘জেনানা' না বলে 'মৰ্দ্দানা' বলেন।
২. র্যাডিক্যাল নারীবাদ পিতৃতন্ত্রের জীবতাত্ত্বিক
(বায়োলজিক্যাল) ও সামাজিক কাঠামোকে লিঙ্গ- বৈষম্যের ভিত্তি বলে চিহ্নিত করে। পরিবার
প্রথা গড়ে ওঠার পর্ব থেকে সন্তান উৎপাদন ও লালনপালনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকায়
নারী গার্হস্থ্যজীবনে বেশি সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়ে; বহির্জগৎ থেকে হয় বিচ্ছিন্ন। ফলে তাকে হতে হয় পুরুষ-নির্ভর।
এই নারীবাদ মনে করে, সন্তান পুনরুৎপাদন ক্ষমতা তথা জৈব-দৈহিক
অবস্থাকে পুঁজি করে সন্তান লালনপালন করা ও গৃহস্থালির কর্ম নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া
হয়েছে। নারী-পুরুষের লিঙ্গ ভূমিকা ক্ষমতার কাঠামোতেও অধস্তন ও ঊর্ধ্বতন বৈষম্যমূলক
স্তরায়নের জন্ম দিয়েছে। র্যাডিক্যাল নারীবাদ মনে করে, লিঙ্গ
ভূমিকাকে ‘সামাজিক ভূমিকা' হিসেবে
আরোপ করার যে পিতৃতান্ত্রিক মনোভাব, তা উৎপাটন করতে পারলে
নারী-পুরুষ বৈষম্য হ্রাস পাবে।
৩. ফরাসি নারীবাদী লেখক ফ্রাসোয়াঁ দ্যুবন
১৯৭৪ সালে Ecofeminism শব্দটি তাঁর Feminisme ou la Mort (নারীবাদ নাকি
মৃত্যু) গ্রন্থে প্রথম ব্যবহার করেন। মূলত ১৯৭০ ও ১৯৮০-র দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে
পরিবেশ-নারীবাদ ধারণাটি দানা বাঁধে। ফ্রাসোয়াঁ দ্যুবন, ক্যারেন
জে ওয়ারেন, ভালো প্লামউড, মারে বুকচিন,
জিম চেনি, বন্দনা শিবা, মারিয়া মাইজ এই তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রবক্তা।
সহায়কপঞ্জি
অতসী চ্যাটার্জী সিনহা ও অঙ্গনা চট্টোপাধ্যায়
(২০২৩)। নারীবাদী গবেষণা পদ্ধতি; একটি তাত্ত্বিক
পরিক্রমা (সম্পাদিত)। কলকাতা: এবং মুশায়েরা
অদিতি ফাল্গুনী (২০১৪)। ‘নারীবাদী সাহিত্যতত্ত্ব, লুপ্ত অতলান্তিক ও ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ', বিশ শতকের
প্রতীচ্য সাহিত্য ও সমালোচনাতত্ত্ব (বেগম আকতার কামাল সম্পাদিত)। ঢাকা: অবসর প্রকাশনা
সংস্থা অভীক গঙ্গোপাধ্যায় (২০১৯)। সাহিত্যতত্ত্ব ও সমালোচনা-সাহিত্য: বিবর্তনে অনুবর্তনে।
কলকাতা: বিগ বুকস
আবদুল মান্নান সৈয়দ (২০১৮)। আবদুল মান্নান
সৈয়দ রচনাবলি সপ্তম খণ্ড। ঢাকা: বাংলা একাডেমি আমিনুর রহমান সুলতান (২০১১)। পশ্চিমবঙ্গে
রোকেয়াচর্চা। ঢাকা: সাকী পাবলিশিং ক্লাব
চিরঞ্জীব শূর (২০১৭)। মনন বিশ্ব পরিচয়
(সম্পাদিত)। কলকাতা: আলোচনা চক্র
নবেন্দু সেন (২০১৮)। পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব
ও সাহিত্যভাবনা (সম্পাদিত)। কলকাতা: রত্নাবলী
বিপ্লব মাজী (২০০৯)। ইকোফেমিনিজিম, নারীবাদ ও তৃতীয় দুনিয়ার প্রান্তিক
নারী। কলকাতা: অঞ্জলি পাবলিশার্স
বেগম আকতার কামাল (২০১৪)। বিশ শতকের প্রতীচ্য
সাহিত্য ও সমালোচনাতত্ত্ব (সম্পাদিত)। ঢাকা: অবসর প্রকাশনা সংস্থা
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (২০০৬)। রোকেয়া
রচনাবলী। ঢাকা: বাংলা একাডেমি
মুর্শিদ এ এম (২০২৩)। ভাবনার বাঁকবাদল: পোস্টমডার্নিজম
পোস্টকলোনিয়ালিজম ইকোফেমিনিজম (সম্পাদিত)। কলকাতা: আবিষ্কার
মোরশেদ শফিউল হাসান (২০১২)। পূর্ব বাংলায়
চিন্তাচর্চা (১৯৪৭-১৯৭১): দ্বন্দ্ব ও প্রতিক্রিয়া। ঢাকা: অনুপম প্রকাশনী
মোরশেদ শফিউল হাসান (১৯৮২)। বেগম রোকেয়া:
সময় ও সাহিত্য। ঢাকা: বাংলা একাডেমি
রাশিদ আসকারী (২০০৩)। উত্তরাধুনিক সাহিত্য
ও সমালোচনা তত্ত্ব। ঢাকা: ফ্রেন্ডস বুক কর্ণার রাশিদা আখতার খানম (২০১৮)। নারীবাদ ও
দার্শনিক প্রেক্ষাপট। ঢাকা: জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনা হুমায়ুন আজাদ (২০০৭)। নারী। ঢাকা:
আগামী প্রকাশনী
হোসনে আরা (২০২১)। "পরিবেশ-নারীবাদ
ও জয়গুন: একটি পর্যালোচনা', বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি পত্রিকা উনচল্লিশতম খণ্ড (সৈয়দ আজিজুল হক সম্পাদিত)।
ঢাকা: এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ
Greta Gaard
and Patrick D. Murphy (1998). Ecofeminist literary Criticism: Theory,
Interpretation, Pedagogy (Edited). USA: University of Illionois Press
Peter Barry
(2018). Begining Theory: An Introduction to literary and cultural theory. New
Delhi: Viva Books Private Ltd.
Rinita
Mazumdar (2010). A short Introduction to Feminist theory. India: Anustup
Publication's Ltd.
Comments
Post a Comment